স্বাস্থ্য প্রযুক্তি

হারানো শ্রবণ কেন ফেরে না: দুটি প্রোটিন, একটি ঝিল্লি আর যে কোষ আর জন্মায় না

সান ফ্রান্সিসকোয় বায়োফিজিক্যাল সোসাইটির সম্মেলনে উপস্থাপিত: ঝিল্লির একটি মৃত্যু-সংকেত ব্যাখ্যা করতে পারে কেন শব্দ, জিন আর কিছু অ্যান্টিবায়োটিকে শ্রবণ চিরতরে যায়।

হারানো শ্রবণ কেন ফেরে না: দুটি প্রোটিন, একটি ঝিল্লি আর যে কোষ আর জন্মায় না

শোনার শুরুটা যান্ত্রিক। শব্দের কম্পনে ভেতরের কানের হেয়ার সেলের ওপরের চুলের মতো অংশগুলো বেঁকে যায়। বাঁকলে চ্যানেল খোলে, কোষে আয়ন ঢোকে, আর কোষটি তৈরি করে সেই সংকেত, যা মস্তিষ্কে পৌঁছায়।

প্রচলিত অর্থে এগুলো চুল নয়, মাথার চুলের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো সংবেদী কোষ, নাম হয়েছে গায়ের সূক্ষ্ম অভিক্ষেপগুলোর কারণে। আর এদের সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো: এরা আর জন্মায় না।

দুটি প্রোটিন, দুটি কাজ

সান ফ্রান্সিসকোয় বায়োফিজিক্যাল সোসাইটির ৮০তম বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাটি টিএমসি১ ও টিএমসি২ প্রোটিন নিয়ে, যা শোনার জন্য অপরিহার্য।

এদের প্রথম কাজটি আগে থেকেই জানা: এরা আয়ন চ্যানেল হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ চুল বাঁকলে যে দরজা খোলে। নতুন তথ্যটি দ্বিতীয় কাজ নিয়ে। গবেষক অ্যাঞ্জেলা বায়েস্তেরোস–এর দল বলছে, এই প্রোটিনগুলো কোষঝিল্লির চর্বিজাতীয় অণু—লিপিড—সাজাতেও সাহায্য করে।

টিএমসি১ ও টিএমসি২ বিগড়ে গেলে হেয়ার সেলটি মরে যায়। যেহেতু এর বদলি আসে না, তাই ওই শ্রবণক্ষতি স্থায়ী। বিগড়ে যাওয়ার কারণগুলোও পরিচিত: জিনগত পরিবর্তন, উচ্চ শব্দের ক্ষতি আর কিছু ওষুধ।

হেয়ার সেল আর ফেরে না
ভেতরের কানে বিকল্প নেই। টিএমসি১ ও টিএমসি২ ঝিল্লি সাজানো বন্ধ করলেই কোষটি মরে যায়, আর ওই শ্রবণ ফেরে না। গ্রাফিক: টেক বিডি।

মৃত্যুর সংকেত

প্রক্রিয়াটি দাঁড়িয়ে আছে ফসফ্যাটিডাইলসেরিন নামের একটি ফসফোলিপিডের ওপর। সুস্থ কোষে এটি ঝিল্লির ভেতরের দিকে থাকে। যখন এটি বাইরের পৃষ্ঠে চলে আসে, কোষটি কার্যত একটি মৃত্যু-সংকেত পায়।

বায়েস্তেরোসের দলের যুক্তি, ঝিল্লি সাজানোর ভূমিকাটি চ্যানেলের ভূমিকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ—শুধু চ্যানেল বিকল হওয়া নয়, ঝিল্লির নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হওয়াই হেয়ার সেলকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

পার্থক্যটি অর্থবহ। কেবল দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যদি কোষ মরত, চিকিৎসার লক্ষ্য হতো দরজাগুলো। কিন্তু একটি লিপিড ঝিল্লির ভুল পাশে চলে যাওয়ায় যদি মরে, তাহলে লক্ষ্য একেবারে অন্য জায়গায়।

অ্যান্টিবায়োটিকের সমস্যা

এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পুরোনো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। অ্যামাইনোগ্লাইকোসাইড অ্যান্টিবায়োটিক শ্রবণের ক্ষতি করে বলে জানা। আবার এগুলো সত্যিই কার্যকর ওষুধ, তাই ক্ষতি জেনেও ব্যবহার চলে।

এখানে বলা হচ্ছে, এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো একধরনের ‘স্ক্র্যাম্বলেজ’ কার্যক্রম চালু করে দেয়, যা ঝিল্লির বিন্যাস এলোমেলো করে—ফসফ্যাটিডাইলসেরিনকে তার জায়গায় রাখে যে সূক্ষ্ম ভেতর-বাহির সাজ, সেটিই ভেঙে যায়।

এনআইএইচ-জেএইচইউ কর্মসূচির বিজ্ঞানী ইয়েন ক্রিস্টিনা পার্ক কাজের কথাটি বলেন: এই ওষুধগুলো কীভাবে স্ক্র্যাম্বলেজ সক্রিয় করে তা বুঝতে পারলে এমন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক নকশা করা সম্ভব, যা স্থায়ী শ্রবণক্ষতি ঘটায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস (এনআইডিসিডি)–এর পোস্টডক্টরাল ফেলো হিউবার্ট লি ফলাফলগুলো ব্যাখ্যা করেন।

কী নেবেন, কী নেবেন না

এটি সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। প্রতিবেদনে কোনো জার্নালের নাম নেই, নমুনার সংখ্যাও নেই—অথচ ফল কতটা পোক্ত তা বুঝতে এই দুটিই দরকার। এখানে একটি প্রক্রিয়ার বর্ণনা আছে, কোনো চিকিৎসা নয়।

তবে এটি কাজে লাগে এমন একটি জিনিস ব্যাখ্যা করতে, যা মানুষ সবচেয়ে কম মেনে নিতে পারেন: শ্রবণক্ষতিতে সেরে ওঠার সময় বলে কিছু নেই কেন। কাটা সারে, কালশিটে মিলিয়ে যায়; কিন্তু উচ্চ শব্দের এক রাতে নষ্ট হওয়া শ্রবণ ফেরে না, কারণ সংশ্লিষ্ট কোষগুলো আর নেই আর ভেতরের কান বাড়তি কোষ জমিয়ে রাখে না।

এ কারণেই যুক্তিটি চিকিৎসার নয়, সুরক্ষার। এই গবেষণার পুরোটাই এমন একটি মৃত্যু বোঝার চেষ্টা, যা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।

সূত্র: প্রথম আলো

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।