বিশ্ব প্রযুক্তি

ইউরোপের ফ্রিজার হামলার দায় কেউ নেয়নি, আর ব্রাসেলস একে বলতে শুরু করেছে ‘ইচ্ছাকৃত’

ইউরোপজুড়ে সুপারমার্কেটের হিমায়ন ব্যবস্থার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার কয়েক দিন পরও তদন্তকারীরা কারও নাম বলেননি, কেউ দায়ও নেয়নি। তবু ব্রাসেলস একে ইচ্ছাকৃত বলছে—আর এই ঘটনার পাশে এমন অনেক কিছু বসানো হচ্ছে, যেগুলো আসলে এর অংশ নয়।

ইউরোপের ফ্রিজার হামলার দায় কেউ নেয়নি, আর ব্রাসেলস একে বলতে শুরু করেছে ‘ইচ্ছাকৃত’

সোমবার ইউরোপের কয়েকটি দেশে এক শর বেশি দোকানে হিমায়ন ব্যবস্থার তাপমাত্রা বেড়ে যায়। কয়েক দিন পরও দুটি কথা একসঙ্গে সত্য—কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় নেয়নি, আর কোনো তদন্তকারী প্রকাশ্যে কারও নাম বলেননি। কেন সুপারমার্কেটকেই বেছে নেওয়া হলো, সেটিও স্পষ্ট নয়।

তবু রাজনৈতিক ভাষা কঠোর হয়েছে। ইইউর কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক কমিশনার ক্রিস্তফ হানসেন ঘটনাগুলোকে জোটের খাদ্য সরবরাহ ‘ব্যাহত করার ইচ্ছাকৃত চেষ্টা’ বলেছেন। তাঁর ভাষায়, পণ্যের পাশাপাশি লক্ষ্য করা হয়েছে ক্রেতার আস্থাকেও। আবার তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘খাদ্যনিরাপত্তা এখন ঝুঁকিতে নেই।’

বাক্যটির দুটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ। একটি বলছে, হামলা লক্ষ্য করে করা। অন্যটি বলছে, অপচয় আর ভোগান্তির বাইরে এখনো বড় কিছু ঘটেনি।

তদন্ত করছে কারা

হামলার দিনই, অর্থাৎ সোমবার, বেলজিয়ামের কৌঁসুলিরা ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেন। ইতালির সরকার পরদিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক ডাকে। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বলতে এটুকুই, আর এর কোনোটি থেকে এখনো কোনো নাম আসেনি।

ইচ্ছাকৃত, তবে দায় নির্ধারিত নয়
ব্রাসেলস একে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত করার ইচ্ছাকৃত চেষ্টা বলছে, আবার বলছে খাদ্যনিরাপত্তা এখনো ঝুঁকিতে নেই। গ্রাফিক: টেক বিডি।

উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞেরা যা বলছেন

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের সাইবার নিরাপত্তার অধ্যাপক আওয়াইস রশিদ সম্ভাব্য উদ্দেশ্যটি সোজা করেই বলছেন—বিপর্যয় ঘটানো। চুরি নয়, মুক্তিপণ নয়, তথ্যও নয়। কিছু খোয়া গেছে বলে খবর নেই, মুক্তিপণের দাবিও আসেনি। এ পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণে বলা যায়, ঘটনাটি ঘটানোই ছিল উদ্দেশ্য।

উত্তরটি অস্বস্তিকর, কিন্তু একে অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে না দিয়ে মেনে নেওয়াই ভালো। নিছক বিপর্যয়ের জন্য করা হামলার দায় নির্ধারণ সবচেয়ে কঠিন, কারণ চেনা সূত্রগুলোই এখানে থাকে না—টাকা কোথায় গেল, তথ্য কে পেল।

যা এই ঘটনার পাশে বসানো হচ্ছে

এই হামলার সঙ্গে একই নিঃশ্বাসে আরও অনেক কিছুর খবর আসছে। কোনটি যুক্ত আর কোনটি নয়, তা স্পষ্ট করে বলা দরকার।

ইউরোপের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, রাশিয়া মহাদেশে ‘ছায়াযুদ্ধ’ বাড়াচ্ছে এবং এর একটি পদ্ধতি সাইবার হামলা। সতর্কবার্তাটি বাস্তব। কিন্তু হিমায়ন হামলার সঙ্গে এটিকে তদন্তকারীদের কেউ যুক্ত করেননি।

গত সপ্তাহে ৬৩০ কোটি ডলারের বাইন্যান্স চুরির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে উত্তর কোরিয়াকে। সেটি আলাদা ঘটনা, আলাদা তদন্ত—দুটিকে কেউ মেলাননি।

ব্রিটেনের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার বলেছে, ২০২৮ সাল নাগাদ রাশিয়া, চীনসহ কয়েকটি রাষ্ট্র ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়মিতই এআই-নির্ভর সাইবার হামলা চালাতে পারে। সেটি দশকের শেষ নিয়ে পূর্বাভাস, এ সপ্তাহের সিদ্ধান্ত নয়। বরং কর্মকর্তারা এখানে ঢোকার পথ হিসেবে দেখিয়েছেন অনেক দিনের পুরোনো, জানাশোনা দুর্বলতাকে—যা নতুন কৌশলের ঠিক উল্টো।

আমেরিকার পাদটীকা

একটি সূত্র অবশ্য সত্যিই যুক্ত, আর সেটি ইউরোপের সুপারমার্কেটের আগের। আগস্টে অ্যারিজোনার ফোর্ট হুয়াচুকা সেনাঘাঁটির দোকানের ফ্রিজার ডিফ্রস্ট মোডে চলে যায়, আর রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্ট নৌঘাঁটিতে হিমায়ন বিকল হওয়ার খবর আসে। চারজন কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, পেন্টাগন এগুলোকে সম্ভাব্য হ্যাকিং হিসেবেই দেখছে এবং মার্কিন তদন্তকারীরা ফরাসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

ইউরোপের ঘটনাগুলোকে ইউরোপের বাইরের কিছুর সঙ্গে যুক্ত করা এ পর্যন্ত এই একটিই সূত্র—আর তা যুক্ত করছে সামরিক ঘাঁটির দোকানের সঙ্গে, কোনো পতাকার সঙ্গে নয়।

ফাঁকটা কেন গুরুত্বপূর্ণ

দায় নির্ধারণ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর ওপর নির্ভর করে ঘটনাটিকে অপরাধ ধরা হবে, নাশকতা ধরা হবে, নাকি কোনো রাষ্ট্রের কাজ ধরা হবে—আর এই তিন উত্তরের পথ তিন দিকে যায়, কৌঁসুলির দপ্তর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত। সেই সিদ্ধান্ত কেউ নিতে না পারা পর্যন্ত সবচেয়ে সৎ বর্ণনা তদন্তকারীদেরটিই—জানা দুর্বলতায় সমন্বিত হামলা, অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হাতে, এমন কারণে যা কেউ বলেনি।

সূত্র: আল জাজিরা

লিখেছেন

Tech BD

টেক বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি স্বাধীন প্রযুক্তি প্রকাশনা, প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। লেখাগুলো আলাদা লেখকের নামে নয়, প্রকাশনার নামেই প্রকাশিত হয়; সংশোধন বা সূত্র নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো যায় info@tech-bd.com ঠিকানায়।