২০২২ সালের ১২ মার্চ শনিবার সকাল সাতটা থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের ত্রিশটি গ্রামের মানুষ জড়ো হতে থাকেন গায়রার সেন্ট ফ্রান্সিস গির্জার মাঠে। শিশুরা গারোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে; ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে ফিরে এসেছেন তরুণেরা। উপলক্ষ একটি মুঠোফোনের সিগন্যাল। প্রথমবারের মতো গায়রা, গাছাবাড়ি ও ইদিলপুরের মাটির ঘরের ভেতরে পৌঁছেছে ফোর-জি ইন্টারনেট; যে ফ্রিল্যান্সাররা গাছে মডেম বাঁধতেন, তাঁরা এখন টেবিলে বসে কাজ করতে পারেন।
তিন সপ্তাহে যা ঘটল
১৮ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো জানায়, নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ৩৫০ গারো তরুণ-তরুণী শুধু ঘরের বাইরে পাওয়া টুজি-থ্রিজি সিগন্যালে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন। প্রতিবেদনটি পড়েন গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান। কয়েক দিনের মধ্যে অপারেটরটি ২৩টি গ্রাম ঘুরে দেখে গায়রায় একটি অস্থায়ী বেস স্টেশন বসায়, যা এখন অনেকটা এলাকায় ফোর-জি দিচ্ছে। স্থায়ী টাওয়ারে লাগবে বন বিভাগের অনুমতি, কারণ গ্রামগুলো সংরক্ষিত বনের ভেতরে; আজমান বলেন, প্রশাসন রাজি হলেই কোম্পানি তা বসাবে।
হাজারের বেশি মানুষের সামনে গারো প্রবীণ নেতারা তাঁর মাথায় জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ মুকুট "কুতুব" পরিয়ে দেওয়ার পর আজমান বলেন, "গ্রামীণফোন প্রথমে কথা বলার সুযোগ করে দিত। এখন আমাদের লক্ষ্য মানুষের সামাজিক ক্ষমতায়ন। নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণ এখানে কী অর্থ বহন করেছে, তা দেখে আমি গর্বিত ও আপ্লুত।"
যিনি শুরু করেছিলেন
সুবীর নকরেক সমাবেশে জানান শুরুর গল্প: ২০১৭ সালে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, প্রথম কাজে ৭৫ ডলার, তারপর একার সামর্থ্যের বেশি কাজ—তাই নিজের উঠানে অন্যদের শেখানো। নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটের এখন পাঁচটি শাখা—গায়রা, ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও জামালপুরে; প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। ফ্রিল্যান্সার বাপ্পু মৃ, হিমালয় হেনরি নকরেক ও পরিতোষ প্রধান নির্বাহীকে জানান গত বছরগুলো কেমন ছিল: গাছের নিচেও সিগন্যাল নেই, রাতে খোলা মাঠ থেকে বিদেশের ক্লায়েন্টকে ফাইল পাঠানো।
অস্থায়ী টাওয়ার কেন শেষ কথা নয়
- অস্থায়ী বিটিএস মানে ট্রেলারে বসানো জেনারেটরচালিত যন্ত্র; স্থায়ী মাস্ট না হওয়া পর্যন্ত কভারেজ ও ধারণক্ষমতা সীমিত।
- ভিডিও কল আর বড় ফাইল আপলোডের জন্য যে ফাইবার ব্রডব্যান্ড দরকার, এলাকায় তা এখনো ২-৩ এমবিপিএস।
- মধুপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন ডজনখানেক গ্রামের জন্য স্থায়ী টাওয়ারে বন বিভাগের অনুমতিই মূল বাধা।
অনুষ্ঠান শেষ হয় প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত লেখক রাহিতুল ইসলামের "কল সেন্টারের অপরাজিতা" বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে। বক্তব্য দেন জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিং নকরেক, গ্রে ঢাকার গাউসুল আলম শাওন ও গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস খায়রুল বাশার।
তিন সপ্তাহের এই গতি যা বলে
গতিটিই ভেবে দেখার মতো। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে কারিগরি কিছুই বদলায়নি: যন্ত্রপাতি ছিল, অপারেটরের হাতে তরঙ্গ ছিল, গ্রামগুলো যেখানে ছিল সেখানেই ছিল। যা বদলেছে তা হলো—ঘাটতিটি প্রকাশ্যে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে লেখা হয়ে গেল।
এখানে অবকাঠামোর সিদ্ধান্ত আসলে কীভাবে হয়, এটি সে সম্পর্কে কাজের এবং খানিকটা অস্বস্তিকর একটি শিক্ষা। বাণিজ্যিক হিসাবে উতরায় না এমন একটি কাভারেজ ঘাটতি পরিকল্পনার স্প্রেডশিটে বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে। সেই একই ঘাটতি যখন গাছে বসে মার্কিন ক্লায়েন্টের কাজ করা এক ব্যক্তির ছবি হয়ে ওঠে, তখন তা দামসহ একটি সুনামের খরচ—আর তার তুলনায় একটি অস্থায়ী টাওয়ারের দাম সামান্য।




