পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গায় বাইন্যান্সের হ্যাকিং ক্রিপ্টোকারেন্সির খবর। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও কাছের বিষয়—এর সঙ্গে জুড়ে থাকা নামটির কারণে।
দুটি ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনালাইসিস জানিয়েছে, এক্সচেঞ্জটি থেকে ৬৩০ কোটি ডলার চুরির পেছনে আছে উত্তর কোরিয়ার সাইবার ইউনিট ল্যাজারাস গ্রুপ—বা ট্রেডারট্রেটর। পরে এফবিআইও একই কথা বলেছে।
এই নামটিই এফবিআই বসিয়েছিল এ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হানার ঘটনায়।
ফেব্রুয়ারি ২০১৬
এফবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির কাজটি ছিল ল্যাজারাস গ্রুপের। ব্যাংকগুলো একে অন্যকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ পাঠাতে যে বার্তা-নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, সেই সুইফটের নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি কাজে লাগিয়েই অভিযানটি চালানো হয়।
এই একই পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে হামলার সঙ্গে, যেখানে কর্মকর্তাদের হাজার হাজার ই-মেইল ফাঁস হয়েছিল, আর বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির সঙ্গে—যার জন্যও এফবিআই উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে।

দুটির মাঝখানে কী বদলাল
২০১৬ আর ২০২৬-এর পার্থক্য আক্রমণকারীতে নয়। পার্থক্যটা হলো, আক্রমণকারী এখন কী লক্ষ্য করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযানে আক্রমণ হয়েছিল নির্দেশের ওপর—সত্যিকারের ব্যাংকের মধ্যে সত্যিকারের টাকা সরানোর জাল বার্তা; এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক আছে, মধ্যস্থতাকারী আছে, আর আছে এমন মানুষ যাঁদের ফোন করা যায়। ওই চুরির কিছু অংশ মাঝপথেই আটকে দেওয়া গিয়েছিল, কিছু অংশ পরে উদ্ধারও হয়েছিল—ঠিক এ কারণেই যে ব্যবস্থাটির ভেতরে মানুষ ছিল।
বাইন্যান্সের অভিযানে আক্রমণ হয়েছে একটি ওয়ালেটের ওপর। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরীয় এজেন্টরা একটি বিশেষ অনুমোদন কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটযুক্ত হট ওয়ালেট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেয়। রাত দুটোয় ফোন করার মতো কোনো করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক এখানে নেই।
টাকা যায় কোথায়
ট্রেডারট্রেটর সম্পর্কে এফবিআইয়ের বিবরণ হলো, দলটি দ্রুত চুরি হওয়া অর্থ বিটকয়েন ও অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর করে এবং তারপর ব্যবহারযোগ্য নগদে বদলে ফেলে। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেধাবী শিক্ষার্থী বেছে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার অধীনে হ্যাকার দল গড়ে তোলে; এ মাসের আগপর্যন্ত কয়েক বছরে এসব দল ৬২ কোটি ডলারের বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়েছে বলে জানা যায়।
বাইন্যান্সের কো-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেছেন, গভীর তদন্তে অননুমোদিত প্রবেশের একাধিক বিন্দু পাওয়া গেছে, আর চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশ উদ্ধার বা সুরক্ষিত করা গেছে; বাকিটা এখনো পাওয়া যায়নি। চেইনালাইসিস জানিয়েছে, হ্যাকাররা এমন কিছু মানি লন্ডারিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছে যা আগে দেখা যায়নি, আর বিশেষজ্ঞদের ধারণা এ অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
এখানকার পাঠকের জন্য কাজের কথাটি সংখ্যার আকার নয়। কথাটি হলো, যে দলটির একসময় দরকার হতো একটি ব্যাংকের বার্তা-ব্যবস্থা আর একগুচ্ছ জাল নির্দেশ, তাদের এখন দরকার হয় একটি হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ আর একটি অনুমোদন।
এখানে যা শেখা হয়েছিল, আর তা কাজে লাগে কি না
২০১৬ সালের পরিণতি নিয়ে বাংলাদেশ কাটিয়েছে কয়েক বছর—উদ্ধারের মামলা, দায় কার তা নিয়ে তর্ক, সুইফট ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা। সেই কাজের বড় অংশই ছিল একটি নির্দিষ্ট বার্তা-ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট দুর্বলতা নিয়ে, আর তাতে ওই পথটি কঠিন হয়েছিল বটে।
বাইন্যান্সের ঘটনা দেখাচ্ছে, পথটিই আসল কথা ছিল না। একই সংগঠন ভিন্ন ধরনের লক্ষ্যে সরে গেছে, যার কাঠামোও আলাদা—আর আন্তব্যাংক বার্তা নিয়ে করা প্রতিরক্ষামূলক কাজ সেখানে কিছুই করে না।
২০১৬ থেকে যে শিক্ষাটি সত্যিই কাজে লাগে, সেটি কারিগরি শিক্ষার চেয়ে সংকীর্ণ ও নীরস। শিক্ষাটি হলো, চুরি আর কারও চোখে পড়ার মাঝখানের সময়টুকুতেই উদ্ধার ঘটে—আর যেসব প্রতিষ্ঠান টাকা ফেরত পেয়েছিল, তারাই পেরেছিল দ্রুত অন্য প্রান্তের একজন মানুষের নাগাল পেতে। কাঠামো যত স্বয়ংক্রিয় হয়, এ সুবিধা তত কমে।




