গত এক বছরে দেশে বিক্রি হওয়া মুঠোফোনের ৬৩ শতাংশই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে—২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি বুধবার দেশের হ্যান্ডসেট নির্মাতাদের এ কথা জানান ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। ২০২১ সালে লাইসেন্স পাওয়া ১৪টি কারখানা বাজারে ছেড়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ফোন; সেখানে কাজ করছেন প্রায় ২৫ হাজার কর্মী।
বিটিআরসিতে যা বলা হলো
বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারের সভাপতিত্বে কারখানার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মুঠোফোন আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, আর দেশে তৈরি ফোনের আন্তর্জাতিক মানের প্রশ্নে বিটিআরসি "এখন বা ভবিষ্যতে কোনো ছাড় দেবে না"। নির্মাতাদের তিনি ট্যাব, ল্যাপটপসহ অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র তৈরিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
শিল্পটি যেভাবে এখানে এল
চার বছর আগেও বাংলাদেশির পকেটের প্রায় প্রতিটি ফোন ছিল আমদানি করা, বেশির ভাগ চীন থেকে। মোড় ঘোরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে—যন্ত্রাংশে শুল্ক কমে, তৈরি ফোনে বাড়ে; এরপর আসে স্থানীয় সংযোজনের লাইসেন্স ব্যবস্থা। প্রথম কারখানা গড়ে ওয়ালটন ও সিম্ফনি; পরে স্যামসাং, ভিভো, অপো, শাওমি, রিয়েলমি, টেকনো, আইটেলসহ অন্যরা, বেশির ভাগই গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। ২০২০ সালে ওয়ালটন প্রথম দেশে তৈরি ফোন রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে, পরে নেপালে।
"মেড ইন বাংলাদেশ" আপাতত মূলত সংযোজন। পর্দা, চিপ, ব্যাটারি এখনো আমদানি হয়; স্থানীয় সংযোজিত মূল্য বলতে কেসিং, প্যাকেজিং, পরীক্ষা আর জোড়া লাগানোর শ্রম। ১৪টি কারখানার সংযোজনের মাত্রা এক নয়; নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলেছে, পরের ধাপে তারা যন্ত্রাংশের কাজও দেশে দেখতে চায়।
ক্রেতার জন্য এর মানে
- দাম। দেশে সংযোজিত ফোনে আমদানির বাড়তি শুল্ক লাগে না; সে কারণেই ১২ হাজার টাকার রেডমি বা রিয়েলমির দাম ভারতের প্রায় সমান।
- গ্রে-মার্কেটের ফোন। একই শুল্কের ফারাক চোরাই হ্যান্ডসেটকে লোভনীয় করে। বৈধভাবে বিক্রি হওয়া প্রতিটি আইএমইআই নিবন্ধনের বিটিআরসির এনইআইআর ডেটাবেসই এর প্রতিকার; অনিবন্ধিত ফোন নেটওয়ার্ক থেকে বন্ধ হতে পারে।
- ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে তৈরি ও বিক্রি হওয়া ফোনে দেশীয় ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস সেন্টার থাকে; গ্রে আমদানিতে সাধারণত থাকে না।
মন্ত্রণালয়ের পরের লক্ষ্য দেশে ল্যাপটপ তৈরি; ওয়ালটন ও সিম্ফনির প্রথম ল্যাপটপ লাইনকে এরই মধ্যে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
ফোন কেনার আগে যা দেখবেন
বাক্সে "মেড ইন বাংলাদেশ" লেখা আছে কি না দেখুন, বিক্রেতার কাছ থেকে রসিদ নিন, আর *#06# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বরটি বিটিআরসির নির্ধারিত নম্বরে এসএমএস করে যাচাই করুন যে ফোনটি বৈধভাবে নিবন্ধিত।
সংযোজন আর উৎপাদন এক নয়
৬৩ শতাংশের হিসাবটি বলে ফোনটি কোথায় জোড়া লেগেছে, কোথায় তৈরি হয়েছে তা নয়। চৌদ্দটি কারখানার বেশির ভাগেই কাজ মানে স্ক্রু লাগানো, সোল্ডারিং আর পরীক্ষা: প্রসেসর আসে তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে, ডিসপ্লে প্যানেল চীন থেকে, ক্যামেরা মডিউল ও মেমোরি আরও অন্য কোথাও থেকে। সংযোজিত একটি সাধারণ হ্যান্ডসেটে স্থানীয় মূল্য সংযোজন সাধারণত শতকরা দশের ঘরেই থাকে।
এটি সমালোচনা নয়—ভারত ও ভিয়েতনামসহ প্রতিটি ইলেকট্রনিকস শিল্পই এভাবেই শুরু করেছে। তবে সংখ্যাটি যে নীতির ফল, তা এতে বোঝা যায়। তৈরি হ্যান্ডসেট আমদানিতে শুল্ক যন্ত্রাংশ আমদানির তুলনায় অনেক বেশি, আর এই ব্যবধানই এখানে সংযোজনকে লাভজনক করে। শিল্পটি পরিণত হচ্ছে কি না, তার সৎ পরীক্ষা সংযোজনের হার নয়। পরীক্ষা হলো—যন্ত্রাংশের কোনোটি এখানে তৈরি হতে শুরু করল কি না, আর কারখানাগুলো নিজেরা কিছু নকশা করল কি না।




